গত ২৬ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে নয়টার দিকে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে ঢাকার উত্তরা থেকে শেরপুরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে নিখোঁজ হন বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্র হাসিবুর। পরে অপহরণকারীরা তাঁর মায়ের কাছে মুক্তিপণ দাবি করেছিলেন। র্যাব ওই ঘটনায় গত মঙ্গলবার রাতে সুনামগঞ্জের তাহেরপুর থেকে হাসিবুরকে উদ্ধার করে। র্যাব ও পুলিশ মিলে অপহরণে জড়িত মোট নয়জনকে গ্রেপ্তার করে।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানায় র্যাব। এতে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, হাসিবুরের বাবা ব্যাটারি বিক্রির ব্যবসা পরিচালনা করতেন। হাসিবুর রাজধানীর উত্তরার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যন্ত্রকৌশল বিভাগে চতুর্থ বর্ষে পড়েন। তাঁর বাবা চার মাস আগে মারা যান। এরপর হাসিবুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি তাঁর বাবার ব্যবসা পরিচালনা করতেন।
হাসিবুরদের বাসায় চার বছর ধরে ছামিদুল গাড়িচালক হিসেবে চাকরি করায় পরিবারের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক তৈরি হয় এবং তাঁদের পারিবারের আর্থিক ও সম্পত্তিসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য জানতেন ছামিদুল। গত ১৬ ডিসেম্বর ছামিদুল ও তাঁর ঘনিষ্ঠ মালেকের নেতৃত্বে অন্যদের সঙ্গে উত্তরার একটি জায়গায় বৈঠক হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, মালেক ও ছামিদুল হাসিবুরকে অপহরণ করে তাঁর পরিবারের কাছ থেকে বড় অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করবেন। বিষয়টি তাঁদের অন্যান্য সহযোগীকে জানিয়ে দেওয়া হয়। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ছামিদুল হাসিবুরকে শেরপুরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ব্যাটারি বিক্রির সম্ভাবনার কথা জানিয়ে তাঁকে শেরপুরে যেতে আগ্রহী করেন।
র্যাব কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, গত ২৬ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে নয়টার দিকে ছামিদুল গাড়ি চালিয়ে হাসিবুরকে শেরপুর নেওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার পর মালেকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী মালেক ও অন্যান্য সহযোগী তিন-চারটি মোটরসাইকেলে করে হাসিবুরের গাড়ি অনুসরণ করতে থাকেন। গাজীপুরের সালনা এলাকায় পৌঁছালে মোটরসাইকেল দিয়ে হাসিবুরের গাড়িটি আটকান তাঁরা। এ সময় তাঁরা হাসিবুর ও ছামিদুলকে গাড়ির পেছনে বসান। ছামিদুল ও মালেকের সহযোগী রনি চালকের পাশের আসনে বসেন এবং রাসেল গাড়ি চালান। মালেক ও অন্যরা মোটরসাইকেলে করে গাড়িটি অনুসরণ করেন। সন্ধ্যার দিকে তাঁরা ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী এলাকা ধোবাউড়ায় পৌঁছান। রাসেল ও বিল্লাল তাঁদের ধোবাউড়ায় পৌঁছে দিয়ে গাড়িটি নিয়ে গাজীপুরে ফেরেন। গাজীপুরের বাসন এলাকায় তাঁরা গাড়িটি ফেলে রাখেন এবং বিল্লাল পুনরায় ময়মনসিংহে চলে যান। পরে রাসেল উত্তরায় হাসিবুরের মায়ের গতিবিধি অনুসরণ করতেন। ধোবাউড়ায় তিন দিন অবস্থানের পর বিল্লাল ছাড়া মালেক, ছামিদুল ও অপহরণকারী চক্রের অন্যরা হাসিবুরকে নিয়ে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের সীমান্তবর্তী এলাকায় যান। রনি তাহিরপুরের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকা ও রাস্তাঘাট ভালোভাবে চেনেন। তাঁরা হাসিবুরকে নিয়ে সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় পাহাড় পরিবর্তন করে অবস্থান করেন। এ সময় তাঁরা হাসিবুরকে পাশবিকভাবে নির্যাতন করেন এবং তাঁর ভিডিও ধারণ করেন।
র্যাব কর্মকর্তা খন্দকার আল মঈন বলেন, পরিবারের সদস্যরা হাসিবুরের ব্যক্তিগত মুঠোফোন নম্বরে ফোন করলে সেটি বন্ধ পান। দীর্ঘ সময় ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারায় হাসিবুরের মা রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। দুই দিন পর ২৮ ডিসেম্বর গাজীপুরের বাসন এলাকায় পরিত্যক্ত অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হাসিবুরের গাড়িটি উদ্ধার করে। পরে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি হাসিবুরের মায়ের হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করে হাসিবুরকে অপহরণ করার কথা বলেন এবং দুই কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। হাসিবুরকে পাশবিক কায়দায় করা নির্যাতনের ভিডিও তাঁর পরিবারের কাছে পাঠানো হয়। এই অবস্থায় গত ৬ জানুয়ারি হাসিবুরের মা রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি অপহরণের মামলা করেন। হাসিবুরের মা তাঁর ছেলেকে উদ্ধারে র্যাবের কাছেও লিখিত অভিযোগ করেন। এরপর র্যাব গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে।
খন্দকার আল মঈন বলেন, পর্যায়ক্রমে তাঁরা দেড় কোটি, তারপর ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ হিসেবে দাবি করেন। মুক্তিপণের টাকা না পেলে হাসিবুরের হাত-পা কেটে ফেলা ও হত্যার হুমকি দেন। মালেক বিভিন্ন সময় মুঠোফোনে হাসিবুরের মাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের প্রাণনাশের হুমকি দেন। পরে হাসিবুরের মা অপহরণকারীদের মুক্তিপণের টাকা দিতে সম্মত হন।
র্যাবের পরিচালক খন্দকার আল মঈন বলেন, গত ২৩ জানুয়ারি অপহরণকারীরা হাসিবুরের মাকে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে যেতে বলেন। বিষয়টি হাসিবুরের মা র্যাবকে জানান। তখন র্যাবের একটি আভিযানিক দল সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে অপহরণকারীদের গ্রেপ্তার করতে গেলে তাঁরা র্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে র্যাবের আভিযানিক দলের ওপর ছুরি নিয়ে হামলা চালান। এতে একজন কর্মকর্তাসহ র্যাবের দুই সদস্য আহত হন। এ সময় র্যাব সদস্যরা অপহরণের পরিকল্পনাকারী মালেক ও ছামিদুলকে গ্রেপ্তার করেন। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হাসিবুরকে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে পাহাড়ি টিলা এলাকা থেকে উদ্ধার এবং অপহরণ চক্রের সদস্য রনিকে গ্রেপ্তার করেন। এ সময় অপহরণকারী চক্রের অপর দুই সদস্য পালিয়ে যান। গ্রেপ্তার মালেকের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত বুধবার রাতে রাসেল ও বিল্লালকে রাজধানীর উত্তরা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে র্যাব–১, র্যাব–৯ ও র্যাব–১৪–এর একটি দল অংশ নেয়। হাসিবুরকে উদ্ধারের সময় তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ও মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।
র্যাব জানায়, মালেক পেশায় একজন গাড়িচালক। তিনি গাড়ি চালানোর পেশার আড়ালে একটি সংঘবদ্ধ অপহরণকারী চক্রের নেতৃত্ব দিতেন। তিনি ধনাঢ্য পরিবারের সদস্যদের নিশানা করে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করেন। মুক্তিপণ দিতে অস্বীকার করলে তাঁরা পৈশাচিক নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে আত্মীয়স্বজনের কাছে পাঠিয়ে মুক্তিপণ আদায় করেন। মালেকের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় অপহরণ, অস্ত্র আইন, বিস্ফোরক আইন, ডাকাতি, ছিনতাই, খুনসহ ১৪টির বেশি মামলা রয়েছে। একটি মামলায় তিনি আট বছরের বেশি কারাভোগ করেন। সর্বশেষ তিনি ময়মনসিংহের একজন অধ্যাপকের ছেলেকে অপহরণের ঘটনায় ৩ বছর কারাভোগ করে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ছাড়া পান। গ্রেপ্তার ছামিদুলও পেশায় একজন গাড়িচালক। তিনি মালেকের অন্যতম সহযোগী ছিলেন। গ্রেপ্তার রনি পেশায় একজন অটোরিকশাচালক। তিনি মালেকের অন্যতম প্রধান সহযোগী। মালেকের নির্দেশনায় তিনি বিভিন্ন সময় দেশের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় অপহৃত ব্যক্তিদের আটকে রেখে নির্যাতন করতেন। অস্ত্র, ডাকাতিসহ দুই মামলায় তিনি ছয় বছরের বেশি সময় কারাভোগ করেন। রাসেল ও বিল্লাল পেশায় গাড়িচালক। তাঁরা মালেকের সহযোগী। হাসিবুরের মা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে যাওয়া ও অন্যান্য গতিবিধি সম্পর্কে মালেককে জানাতেন রাসেল। অপহরণের পর গ্রেপ্তার বিল্লাল ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা এলাকায় অবস্থান করেন এবং হাসিবুরের মা তাঁর ছেলেকে উদ্ধারে নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন এলাকায় যান। গ্রেপ্তার বিল্লাল তাঁকে অনুসরণ করতেন এবং গতিবিধিবিষয়ক তথ্য মালেককে জানাতেন। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা একাধিক মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ করেছেন বলে জানা যায়।
অভিযান তদারকি কর্মকর্তা র্যাব-১–এর পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোস্তাক আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, অপহরণকারীদের কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানায় তাঁদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা করা হয়েছে।
উত্তরা পশ্চিম থানায় হওয়া অপহরণ ও অস্ত্র আইনের দুই মামলা থানা থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগে (ডিবি) স্থানান্তর করা হয়েছে। মামলার তদন্ত তদারকের সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা আজ রাতে প্রথম আলোকে বলেন, অপহরণের অভিযোগে র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার পাঁচজনকে আজ ডিবির কাছে সোপর্দ করা হয়েছে। আর অপহরণের ঘটনায় ডিবির হাতে গ্রেপ্তার পাঁচজনকে সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
.png)
No comments
Post a Comment